বিএনপি কি সংঘাতের রাজনীতি থেকে সরে আসছে | ইবিডি নিউজ
শনিবার, নভেম্বর ১৭পরীক্ষা মূলক

বিএনপি কি সংঘাতের রাজনীতি থেকে সরে আসছে

রাজনীতিবিদরা যেমন দেশের পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তুলতে পারেন, তেমনি শান্তি-সমাঝোতার পরিবেশও যে তৈরি করতে পারেন তার প্রমাণ গত ৫ জানুয়ারি পাওয়া গেছে। গত দুই বছর ৫ জানুয়ারি কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতি হয়ে উঠেছিল সংঘাতময়। এবার হল তার ব্যতিক্রম। এ বছর ৫ জানুয়ারি ঘিরে রাজনীতির আকাশে কালো মেঘ দানা বাঁধার আগেই তা কেটে গেছে। এ কৃতিত্ব অবশ্যই রাজনীতিবিদদের।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই নির্বাচন ভালো পরিবেশে হয়নি। দেশের অন্যতম বড় দল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট যেমন ওই নির্বাচনে অংশ নেয়নি, তেমনি আরও প্রায় এক ডজন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলও নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত ছিল। বিএনপি ও তার মিত্ররা নির্বাচন প্রতিহত করার ডাক দিয়ে সারাদেশে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত কয়েকশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে, প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মেরে, ভোটারদের হত্যা করে, ভয়ভীতি দেখিয়ে দেশে একটি ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করে। তবু ওই জোট নির্বাচন বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছিল।

৫ জানুয়ারির নির্বাচনে সঙ্গত কারণেই ভোটার উপস্থিতি কম ছিল। ১৫৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় কোনো ভোট হয়নি। এটা নির্বাচনী গণতন্ত্রের একটি বড় ব্যত্যয়। তবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়াও এক ধরনের নির্বাচন। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকলে একক প্রার্থীকে ‘নির্বাচিত’ ঘোষণা করা আমাদের নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী বৈধ। কাজেই ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে যত তর্ক-বিতর্কই থাক না কেন, ওই নির্বাচনকে বেআইনি কিংবা অবৈধ বলার সুযোগ নেই।

৫ জানুয়ারির ‘খারাপ’ নির্বাচনের জন্য সরকারকে ও নির্বাচন কমিশনকে আমরা গালমন্দ করতেই পারি; কিন্তু ও রকম একটি মন্দ নির্বাচন যে দেশে হল সে দায় বিএনপি ও তার মিত্ররা কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। কারণ একতরফা একটি নির্বাচনের সুযোগ তারাই করে দিয়েছে। নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি ও তার মিত্ররা আওয়ামী লীগ এবং তার সহযোগীদের ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার সুযোগ করে দিল। রাজনীতি কৌশলের খেলা। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনী রাজনীতির সে খেলায় বিএনপি হেরেছে।

বিএনপিকে নির্বাচনে আনার জন্য আওয়ামী লীগ তথা সরকার পক্ষের চেষ্টা ছিল। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করে আলোচনায় বসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। নির্বাচনকালীন সরকারে অংশ নেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। কিন্তু বেগম জিয়া ইতিবাচক সাড়া দেননি। প্রধানমন্ত্রী টেলিফোন করার পর তিনি যেভাবে এবং যে ভাষায় কথা বলেছিলেন, তা অনেকের কাছেই ‘ভব্য’ আচরণ বলে মনে হয়নি।

সরকার পক্ষ থেকে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনটি ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় নিয়মরক্ষার নির্বাচন’ হিসেবে উল্লেখ করে নির্বাচনটি নির্বিঘ্নে অনুষ্ঠানে বাধা না দেওয়ার জন্যও বিএনপি জোটের কাছে আহ্বান জানানো হয়েছিল। খালেদা জিয়া কোনো কিছুই শোনেননি। তিনি ভেবেছিলেন, দেশে জ্বালাও-পোড়াও করে সন্ত্রস্ত পরিস্থিতি তৈরি করলেই হয়তো নির্বাচন বন্ধ হয়ে যাবে। আর যদি যেনতেন প্রকারে একটি নির্বাচন করাও হয়, তাহলেও প্রবল গণআন্দোলনে নির্বাচনের কয়েক দিন যেতে না যেতেই সরকারের পতন হবে। যেমন হয়েছিল ১৯৯৬ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর।

বেগম জিয়া ভুলে গিয়েছিলেন, রাজনীতিতে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি সহসা হয় না। শেখ হাসিনা প্রবল প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ৫ জানুয়ারি নির্বাচন সম্পন্ন করেছেন। রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রেখেছেন। ওই নির্বাচন না হলে দেশে সাংবিধানিক শাসন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিত।

৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রতিহত করার জন্য বিএনপি-জামায়াত যেভাবে শক্তি প্রয়োগ করেছিল, যেভাবে মানুষের জীবনকে শঙ্কার মধ্যে ফেলেছিল, তাতে তারা রাজনৈতিকভাবে মোটেও লাভবান হয়নি। সাধারণ মানুষ তাদের বাড়াবাড়ি পছন্দ করেনি। মানুষের সমর্থন না পাওয়ায় ৫ জানুয়ারির পর বিএনপি আর তেমন কোনো কর্মসূচিও দিতে পারেনি। রাজনীতির মাঠ থেকে তারা কিছুটা ছিটকে পড়েছে।

দশম সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি জোট যে বড় ধরনের ভুল করেছিল, তার কোনো মূল্যায়ন-পর্যালোচনা না করেই নির্বাচনের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে গত বছর ৫ জানুয়ারিকে ঘিরে আবারও রাজনৈতিক হঠকারিতার পথে পা দেয়। সরকার পতনের ডাক দিয়ে গত বছরের জানুয়ারির শুরু থেকে এপ্রিলের শুরু পর্যন্ত হরতাল-অবরোধ দিয়ে ও্ই জোট দেশজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।

আন্দোলনের নামে এমন বর্বরতা-নৃশংসতা দেশের মানুষ অতীতে দেখেনি। যানবাহনে পেট্রল বোমা নিক্ষেপ করে যেভাবে অসহায় নারী-পুরুষ-শিশুদের পুড়িয়ে মারা হয়েছে অথবা দগ্ধ করা হয়েছে, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটে আগুনে পোড়া মানুষের যে রকম আর্তচিৎকার ধ্বনিত হয়েছে, তা একাত্তরে পাকিস্তানি ঘাতক সেনাবাহিনীর নৃশংসতাও হার মানিয়েছে।

তিন মাস নাশকতা-বর্বরতা চালানোর পর বেগম জিয়ার হয়তো বোধোদয় হয় যে, তিনি যা করছেন তা তাকে জয় এনে দেয়নি, দেবে না। তাই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অবরোধ’ কর্মসূচি প্রত্যাহার না করেই ঘরে ফিরে যান। অথচ তিনি অঙ্গীকার করেছিলেন, সরকার পতন না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরবেন না।

পর পর দুই বছর ৫ জানুয়ারি যেমন গরম ছিল, কারও কারও মনে তাতে আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল যে, এবার ৫ জানুয়ারি কেন্দ্র করেও বুঝি রাজনীতির মাঠ সে রকমই গরম হয়ে উঠবে। ৫ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের আয়োজন কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মুখোমুখি অবস্থান নিচ্ছে মনে করে অনেকের মধ্যে এক ধরনের ভীতিও তৈরি হচ্ছিল।

কিন্তু উত্তেজনা ছড়াতে না ছড়াতেই রাজনীতিতে সুবাতাস বয়ে যাওয়ার লক্ষণ দেখা দেয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার ওপর পুলিশের নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ায় এবং সেই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নিজ নিজ দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশের অনুমতি পাওয়ায় এটা স্পষ্ট হয় যে, বিএনপি এবার নমনীয়তার পথেই হাঁটছে। সংঘাত এড়াতে চাইছে। যে কোনো মূল্যে সমাবেশ করার একরোখা জেদ বিএনপি নেতারা করেননি। এমনকি অনুমতি না পেলে সমাবেশ করা হবে না বলেও আগেভাগেই জানানো হয়েছিল।

বিএনপির এই ‘সুমতি’ যদি গত দুই বছর দেখা যেত, তাহলে দেশের রাজনীতিতে সুস্থ ধারা ফিরে আসার পথ এতটা অমসৃণ হত না বলেই অনেকে মনে করেন।

৫ জানুয়ারির সমাবেশে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া যে বক্তৃতা করেছেন, তাও অনেকের কাছে ছিল অপ্রত্যাশিত। আগে যেখানে বক্তৃতা দিতে উঠলেই সরকার পতনের সময়সীমা বেঁধে দিতেন, সেখানে এবার বলেছেন একেবারে ভিন্ন কথা। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনার আলোচনার আমন্ত্রণ যার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি, সেই খালেদা জিয়াই এবার ৫ জানুয়ারি বললেন, ‘‘আমরা চাই আলাপ-আলোচনা করে সমাধানের একটি পথ বের করতে, নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে। এ জন্য একসঙ্গে কাজ করতে চাই। যেহেতু তারা জোর করে ক্ষমতায় বসে আছে, এ দায়িত্ব তাদের।’’

বেগম জিয়া আরও বলেছেন, ‘‘কারও বিরুদ্ধে আমাদের রাগ-ক্ষোভ-দুঃখ নেই। আসুন, সংলাপ করে, আলোচনা করে সমাধানের পথ বের করি, গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনি। এতে কারও ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আপনারা ভালো থাকেন, ভদ্র থাকেন, তাহলে আমাদেরও ক্ষোভ থাকবে না। যা করেছেন ভুল করেছেন, মনে মনে তা স্বীকার করে নেন।’’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বেগম জিয়ার এই বক্তৃতা গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছেন। তাঁর মাথায় ‘আন্দোলন’ করে সরকার পতনের যে ভূত চেপেছিল, তা দূর হয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে এই সমঝোতার মনোভাব তিনি কতদিন ধরে রাখবেন, তাঁর পরামর্শদাতারা তাঁকে উস্কানি দেওয়া থেকে কতদিন বিরত থাকবেন কিংবা সরকারই বা কতটা ‘ভদ্র’ আচরণ বিএনপির প্রতি করবে, সে সব প্রশ্নও যে উঠছে না তা নয়।

৫ জানুয়ারির দলীয় সমাবেশে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম অবশ্য বিএনপিকে হুমকি-ধমকি না দিয়ে সমাঝোতার অনুকূলে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘‘আসুন, আমরা শান্তিপূর্ণ রাজনীতি এগিয়ে নিয়ে যাই।’’

আওয়ামী লীগের পক্ষে সম্ভব হলেও বিএনপির পক্ষে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন আদৌ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব কি না তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক-পর্যবেক্ষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে বিএনপির অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা দুটোই কম। আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা যে বলে থাকেন যে, আন্দোলন করার ‘মুরোদ’ বিএনপির নেই, সেটা খুব ভুল বলেন না।

আওয়ামী লীগ আন্দোলন-সংগ্রামের দল। বিএনপি কিন্তু তা নয়। অনেকে বরং বিএনপিকে চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের দল বলেই মনে করে। দুই দলের জন্ম-প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করলেই তা বোঝা যায়। তবে বিএনপি ও তার সমর্থকরা এই বক্তব্য মানবেন না, বরং তেতে উঠবেন। অথচ তাতে সত্যের হেরফের হবে না।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশে অসংখ্য সফল গণআন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বও দিয়েছে তারা। কিন্তু বিএনপি নেতৃত্বে দেশে কোনো সফল গণআন্দোলন হয়েছে, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি আন্দোলন করে কোনো কিছু অর্জন করেছে বলে কি প্রমাণ দেওয়া যাবে?

এরাশাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়া আপসহীন নেত্রীর অভিধা পেলেও তিনি এককভাবে আন্দোলন করে কি এরশাদের পতন ঘটাতে পেরেছিলেন? ১৯৮৬ সালে এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তটি যারা বেগম জিয়ার রাজনৈতিক দৃঢ়তা বলে মনে করেন, তারা কিন্তু এটা বলেন না যে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপিও যদি ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করত তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াত?

নির্বাচনের মাঠে যদি আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপি থাকত তাহলে কি এরশাদের পক্ষে ভোট ডাকাতি-মিডিয়া ক্যু করা খুব সহজ হত? ১৯৮৬এর নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বেগম জিয়া প্রকারান্তরে এরশাদকেই সহযোগিতা করেছেন– এমন বিশ্লেষণ অংশগ্রহণযোগ্য মনে করার পক্ষে জোরালো যুক্তি আছে কি?

আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ছাড়া নব্বইয়ের গণআন্দোলন সফল হত না। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ যখনই সরকার গঠন করেছে, তখনই সে সরকারকে মেয়াদপূর্ণ করতে না দেওয়ার হুংকার দিয়ে খালেদা জিয়া আন্দোলনে নামলেও সাফল্য পাননি একবারও। খালেদা জিয়া বা বিএনপির আন্দোলনে শেখ হাসিনার সরকার কখনও পিছু হটেনি, পিছু হটেছেন খালেদা জিয়া ও তাঁর দলবল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক-পর্যবেক্ষকদের অনেকেই এটা মনে করেন, গণআন্দোলন গড়ে তোলার পারদর্শিতা না থাকলেও আন্দোলনের নামে সন্ত্রাস-সহিংসতা করার সক্ষমতা বিএনপির আছে। বিশেষ করে জামায়াতের সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক সখ্যতা তাদেরকে সন্ত্রাসের রাজনীতিতে বেশি সক্ষম করে তুলেছে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে বিএনপি গণতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে যতটা সম্পৃক্ত হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে জামায়াতের সঙ্গে অতিরিক্ত মাখামাখির কারণে তা একেবারেই শিথিল হয়ে পড়েছে।

বিএনপি-দরদি অনেকেই এখন এটা বলছেন যে, বিএনপি জিয়াউর রহমানের আদর্শ থেকে দূরে সরে গেছে। বিএনপিকে এক সময় না-ডান, না-বাম অর্থাৎ ‘মধ্যপন্থী’ দল হিসেবে বিবেচনা করা হত। কিন্তু অতিরিক্ত জামায়াতনির্ভরতা তাদের এখন কার্যত জামায়াতের বি-টিমেই পরিণত করেছে। হেফাজতের কর্মসূচির প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়ে, গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের বিচারের প্রশ্নে দোদুল্যমানতা দেখিয়ে, জামায়াতের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখে, মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহীদের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলে, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখিয়ে বিএনপি এখন চরম ডানে অর্থাৎ প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থানে চলে গেছে।

কেউ কেউ হয়তো বলবেন যে, বিএনপির এখনও প্রচুর জনসমর্থন আছে, ভোট আছে। হ্যাঁ, আছে। ১৯৭০এর নির্বাচনে সব মানুষ আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতাকারীর সংখ্যাও কম ছিল না। স্বাধীন দেশে ওদের সংখ্যা কমেনি, বরং বেড়েছে। একাত্তরে একজন নিজামী কিংবা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ অথবা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বা কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামানের জায়গায় এখন তাদের কতজন করে ছেলেমেয়ে ওই আদর্শ ধারণ করে চলেছে সে হিসাব করলেই স্বাধীনতাবিরোধীদের শক্তি অনুমান করা যাবে।

আবার যারা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল, তাদের সবার আদর্শিক অবস্থান এখন সে জায়গায় নেই। প্রগতিশীলদের সংখ্যা কমেছে। প্রতিক্রিয়াশীলদের বেড়েছে। তাই বিএনপির জনসমর্থন, ভোট থাকবে না কেন?

জনসমর্থনের সঙ্গে বিএনপি যদি রাজনৈতিক নীতি-কৌশলের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনে, চরম প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থান থেকে মধ্যপন্থার দল হিসেবে নিজের পরিচয় উজ্জ্বল করে তুলতে পারে তাহলে সেটা হবে দেশের রাজনীতির জন্য বড় সুখবর। সাম্প্রতিক ঘটনাবলী দেখে মনে হচ্ছে, দলটি সংঘাতের রাজনীতি থেকে সরে আসছে।

এটা যদি স্থায়ী হয়, তাহলে ভালো। কিন্তু সেটা হবে কি?