বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় নৈতিকতাহীন শিক্ষার প্রভাব | ইবিডি নিউজ
রবিবার, আগস্ট ১৯পরীক্ষা মূলক

বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় নৈতিকতাহীন শিক্ষার প্রভাব

sourthenদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে শিক্ষায় আমাদের আমূল পরিবর্তন হয়েছে। শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দ্রুত প্রসার ঘটছে। নগরের পাশাপাশি গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে যাচ্ছে নব্য শিক্ষিত শ্রেণির সংখ্যা যা সত্যিকার অর্থে আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য শুভ সংবাদ। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় আমাদের শিক্ষিত সমাজ দেশের কল্যাণের জন্য যতটুকু করার প্রয়োজন ছিল সে তুলনায় তাদের অংশিদারিত্ব খুবই হতাশাব্যঞ্জক। সুশিক্ষা মানুষকে খারাপ নৈতিকতাহীন কর্মকা- থেকে বিরত থাকার অভিপ্রায় জাগায় আর সততা ও আদর্শকে গ্রহণ করার উৎসাহ দেয়। তবে বর্তমান শিক্ষায় ব্যবস্থায় এমন আদর্শিক প্রবণতা খুব একটা চোখে পড়েনা । এক সময় গুরুজনরা বলতো শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য জ্ঞানার্জন ও নিজেকে পরিশুদ্ধ করার একটি উৎকৃষ্ট প্রক্রিয়া কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তা বড্ড বেমানান। এখন আমরা শিক্ষাকে টাকা উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছি। বর্তমান প্রজন্মে কাছে সর্বোচ্চ ডিগ্রির মূল উদ্দেশ্য হলো ভালো চাকরীর প্রত্যাশা যার পরতে পরতে টাকা উর্পাজনের নেশা। শুধুমাত্র অর্থ উপার্জনের নেশায় সারা জীবনের পঠিত নীতি কথাগুলো বস্তাবন্দি করে নিজের বিবেককে বিসর্জন দিচ্ছে প্রচলিত ধারায় টিকে থাকার জন্য। “ যার যত বড় চাকরী সে তত বেশি জ্ঞানী, আর যত বেশি টাকা সে তত বেশি সম্মানিত। এটাই এখন সবার মুখে মুখে আলোচিত সংলাপ। অর্থাৎ এই দু’টি বিষয়ের আবর্তে আমাদের মর্যাদার মাপকাঠি ঘূর্ণায়মান। অর্থ উপার্জনের এই নেশার ফাঁদে চলমান স্ত্রোতে নিজেদের অতিমাত্রায় আসক্ত করে ফেলেছে শিক্ষিত সমাজ। যার দরূণ বদলে যাচ্ছে শিক্ষার ঐতিহ্যগত রূপ। ফলে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা খুব সহজে চাকরী পাওয়া যায় এমন বিষয়ের প্রতি ঝুঁকছে জ্যামিতিক হারে। যা মোটেও আশাব্যঞ্জক খবর নয়। বর্তমান সময়ের এ ধারাকে কখনো দেশের সামগ্রিক কল্যাণের প্রত্যাশিত উন্নয়নের রেখা চিত্র বলতে পারিনা। মূলত মানুষের এই অপ্রত্যাশিত প্রতিযোগিতার পিছনে যে বিষয়টি টনিক হিসেবে কাজ করছে তা হলো বেশি টাকা উপার্জনের নেশা। অল্প সময়ের ব্যবধানে কিভাবে প্রচুর সম্পদের মালিক হয়ে ব্যক্তিগত চাহিদাগুলো আয়েশিভাবে মিটানো যায় এটাই একমাত্র আকাঙ্খা। আর এই প্রবণতা দিন দিন ব্যাপক হচ্ছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমাদের বুদ্ধিজীবীরাও আজ এই ভয়ানক নেশার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে যা দেশের জন্য অশনি সংকেত। উচ্চপদস্থ থেকে শুরু করে পিয়ন পর্যন্ত সরকারি আমলারা অধিকাংশই দুর্নীতির সাথে জড়িত। অনেকে কোটি কোটি টাকার মালিক। আর তাদের এই ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের পেছনে সততা ও নীতি যে ছিলনা তা বলা বা বুঝার জন্য কোনো ব্যাখ্যর প্রয়োজন পড়বে না আশাকরি। নীতিকে বিসর্জনের মাধ্যমে আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে অসৎ উপায়ে তারা আজ বিশাল সম্পদের মালিক বনে গেছে। অথচ এরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী শিক্ষিত সমাজভুক্ত সদস্য। তাহলে কী শিক্ষা আমাদের নৈতিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করতে পারেনি? যদি শিক্ষা আমাদের নৈতিক মূল্যবোধকে সত্যি জাগাতো তাহলে সমাজে এমন আচরণ পরিলক্ষিত হতোনা। আমরা শিক্ষিত হয়েছি তবে নৈতিকতাকে দূরে ঠেলে। আমাদের সমাজে আজ জ্ঞানী লোকের চেয়ে বেশি প্রয়োজন ভালো মানুষের কারণ শিক্ষিত সমাজ থেকে অনুসরণ বা অনুকরণ করার মতো কোনো আদর্শ খুঁজে পাওয়া যায়না। গুটিকয়েক যারা আছে তারাও নিজেদের নিয়ে হতাশাগ্রস্ত । সমাজ থেকে হারিয়ে গেছে একে অন্যর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। বিশ্বাসের জায়গাটি বিলুপ্তির পথে। যে মহান শিক্ষা গুরু মানুষ গড়ার কারিগর তাঁরাও আজ নীতিকে বিসর্জন দিয়ে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে মহাব্যস্ত। নিজেদের অবস্থানকে সুদৃড় করতে ও নিজেকে জাহির করতে বেছে নিচ্ছে নৈতিকতাহীন পন্থা।রাজনীতিকে পুঁজি করে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীরাই সুযোগ পাচ্ছে সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠে শিক্ষকতা করার। পরবর্তীতে এই মহান শিক্ষকরাই শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করে শিক্ষক হওয়ার সেই চিরচেনা পথে। শিক্ষকদের প্রমোশন এখন আর আগের মতো গবেষণা দিয়ে হয়না। এই কাজে বেশি প্রয়োজন রাজনীতির খেলা ও উচ্চপদস্থদের তোষামোদ। রাজনীতির নোংরা থাবায় শিক্ষক সমাজও আজ দ্বিধান্বিত। দুর্নীতি আর কোন্দলে ভরে গেছে অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, সাংবাদিক, পুলিশ, সরকারি বেসরকারি সব পেশার মানুষ আজ সেবা ও নীতির চেয়ে টাকাকে প্রাধান্য দিচ্ছে বেশি। হ্যাঁ ব্যতিক্রম যে আছে তা অস্বীকার করছি না । ভালো মানুষও আছে তবে এদের সংখ্যা হাতে গুণা খুব সামান্য যা দিয়ে একটি সুন্দর সমাজ বা দেশ বিনির্মাণ করা দূরহ ব্যাপার। নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে যদি সৎ মানুষের সংখ্যা বাড়ানো যায় তাহলে আগামী দিনে একটি সুন্দর সমাজ আশা করতে পারি। যা হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি আদর্শ। আমাদের দেশে অসংখ্য প্রতিযশা মেধাবীরা আছেন যারা ইতোমধ্যে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করে দেশের জন্য সুনাম বয়ে এনেছেন। কিন্তু মেধাবীদের অনেকে আবার নীতিকে বিসর্জন দিয়ে সম্পদের পিছনে ছুটছেন যা একটি সুন্দর দেশের প্রকৃত রূপ হতে পারেনা। এদেশের রাজনীতিবিদদের কথা নতুন করে বলার কিছুই নেই। দেশের চলমান অস্থিরতার মূল কারণ হচ্ছে অসুস্থ রাজনীতি। আর এর জন্য দায়ী রাজনীতিবিদরা। ক্ষমতা লাভের জন্য তারা নীতিকে বস্তাবন্দি করে। তারপর মিথ্যা আদর্শের কথা বলে জনগণের সাথে ধোঁকা ধোঁকা খেলায় মেতে উঠে। তাদের মুখে মুখে গণতন্ত্রের বুলি হলেও হৃদয়ে স্বৈ¦রাচারী। সব রাজনৈতিক দলের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য একই অর্থাৎ যেকোনো উপায়ে ক্ষমতা গ্রহণ। এরা আসলেই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। অথচ তারা যদি সত্যিকার অর্থে দেশ ও মানুষের কথা ভাবতো তাহলে দেশের আজ এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হতোনা। আর এই অসুস্থ রাজনীতির পিছনেও টনিক হিসেবে কাজ করছে অর্থ। ক্ষমতায় গিয়ে আইনের অপব্যবহার করে অবৈধ উপায়ে প্রচুর সম্পদের মালিক হবে এট্ইা তাদের প্রধান লক্ষ্য। আর এভাবে অসুস্থ রাজনীতির উপর ভর করে কখনো দেশ এগিয়ে যেতে পারেনা। সত্যি কথা হলো হাতে গুণা কিছু গণতন্ত্রকামী রাজনীতিবিদ দিয়ে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব । এদেশের রাজনীতিবিদরা শিক্ষাকেও ব্যবহার করে তাদের ক্ষমতা লাভের হাতিয়ার হিসেবে। আবার অনেক রাজনীতিবিদ আছেন যাদের মধ্যে নৈতিকতা বা শিক্ষা কোনোটাই নেই অথচ এরাই রাষ্ট্রের সুউচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত। তাহলে আমরা সচেতন শিক্ষিত হয়েও কেন বার বার এমন অযোগ্য লোকদের হাতে দেশের ভার তুলে দিই? অবশ্যই এর অগোচরে আমাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িত যার মাধ্যমে আমাদের নৈতিক দুর্বলতার বর্হিপ্রকাশ ঘটে। প্রবাদে আছে দুর্জন বিদ্ধান হলেও সর্বদা পরিত্যাজ্য কিন্তু আমরা কী পেরেছি এসব নীতি কথাকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে? নৈতিকতা প্রশ্নে আমাদের শিক্ষিত সমাজেরও তেমন কোনো মাথা ব্যথা নেই, আর যাদের আছে তাদের কথাগুলোর শুনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ে অধিষ্ঠিত ক্ষমতাবানরা তেমন আগ্রহ দেখায় না। তাদের কাছে এসব নীতি বাক্য নিতান্তই হাস্যকর ও পরিহাসের বিষয়।

সামাজিক বন্ধনগুলো আজ খুব নড়বড়ে, অকৃত্রিম বা পরম ভালোবাসা কোনো কিছুরই অস্থিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়না বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায়। মানুষ খুব বেশি স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক চিন্তায় মগ্ন। এসব মূলত নৈতিকতাহীন শিক্ষার ফসল। আমরা যদি নৈতিকতা প্রশ্নে আপোষহীন থাকতাম তাহলে জাতি হিসেবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে গর্ব করতে পারতাম। কিন্তু আমাদের নৈতিক মূল্যবোধ সেভাবে গড়ে ওঠেনি। আমরা পারিনি জাতি হিসেবে সৎ হতে। সততা কিংবা সার্বজনীন কল্যাণ কামনা আমাদের অন্তরে প্রষ্ফুটিত হয়নি। আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি নিজেকে ভালো মানুষ হিসেবে তৈরি করা। যদি আমরা ভালো মানুষ হতে ব্যর্থ হয় তাহলে আমাদের শিক্ষা দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে না এনে সামাজিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দেবে জাতিকে। বেঁচে থাকা বা টিকে থাকার জন্য অর্থের প্রয়োজন অপরিহার্য। কিন্তু মনে রাখতে হবে নিজের নীতিকে বিসর্জন দিয়ে দেশের ক্ষতি করে অর্থ উপার্জনের পথ বেছে নেওয়া মোটেও সামাজিক ভারসাম্যমূলক আচরণ নয়। এতে সমাজে অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। আমাদের সবার উচিৎ দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে নিজেদের বিলিয়ে দেওয়া। নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত হয়ে সুশিক্ষায় নিজেদের সমৃদ্ধ করা। সব মানুষের জন্য সমান সুযোগ থাকবে এমন একটি সুন্দর দেশের স্বপ্ন লালিত হোক আমাদের বুকে। নৈতিকতা প্রশ্নে আপোষহীন থেকে সুশিক্ষার মাধ্যমে সার্বজনীন কল্যাণে নিজেেেদর উৎসর্গ করাই হবে আমাদের একমাত্র ব্রত। দেশ প্রেমে ভরে ওঠবে আমাদের হৃদয়। আগামী প্রজন্মের জন্য বাংলাদেশ হোক চির শান্তির আবাস এটাই সকলের কাম্য।

বি.দ্র.-আমার এই লেখা কাউকে বা কারো প্রতি উদ্দেশ্য করে নয়। শুধুমাত্র নিজের বিবেককে প্রশ্ন করে এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি। যদি কেউ নিজেকে সৎ ও সত্যবাদি ভাবেন তাহলে অনুরোধ থাকবে বিষয়টিকে নিজের গায়ে না টেনে আত্ম সুখে ভাসবেন।

মো. সাইদুল ইসলাম চৌধুরী
বিএ(অনার্স)এমএসএম, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, চবি
উপাচার্য মহোদয়ের একান্ত সচিব ও জনসংযোগ কর্মকর্তা
সাদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ