সংস্কার না ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চান সৌদি যুবরাজ? | ইবিডি নিউজ
রবিবার, আগস্ট ১৯পরীক্ষা মূলক

সংস্কার না ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চান সৌদি যুবরাজ?

সৌদি রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বেশ কিছুদিন থেকেই সামনে আসছে। চলতি বছরের জুনে সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকারী মোহাম্মদ বিন নায়েফকে সরিয়ে যুবরাজের দায়িত্ব নেন বর্তমান রাজার পুত্র মোহাম্মদ বিন সালমান (৩২)। গৃহবন্দি হন নায়েফ। সে সময়ই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো একে নিরব অভ্যুত্থান হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। তবে চলতি মাসে রাজপরিবারের অস্থিরতা লক্ষ্যণীয়ভাবে সামনে আসে। ৪ নভেম্বর ২০১৭ শনিবার রাতে দেশটির ১১ জন প্রিন্স, চারজন বর্তমান মন্ত্রী এবং ১০ জন সাবেক মন্ত্রীকে আটক করা হয়। এছাড়া দুই প্রিন্স নিহত হওয়ার খবর এসেছে। ব্যাপক রদবদল করা হয়েছে মন্ত্রিসভায়। সবগুলো ঘটনায় উঠে আসছে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নাম। যুবরাজের দাবি, তিনি দেশে সংস্কার করতে চান। তবে সমালোচকরা বলছেন, তিনি আসলে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চান। নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েমের পথে যাদেরই অন্তরায় বলে মনে করছেন; তাদেরই তিনি সরিয়ে দিচ্ছেন।

ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে যুবরাজ সমাজের সর্বস্তরে ঝাঁকুনি দিচ্ছেন। এমনকি এতোদিন যাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে বলে মনে করা হতো; তারাও আর ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছেন না। ৪ নভেম্বর আটক হওয়া ব্যক্তিদের প্রত্যেক্যেই রাজপরিবারে খুবই প্রভাবশালী। আর নিহত প্রিন্স মানসুর বিন মাকরিন অন্যদের সরিয়ে মোহাম্মদ বিন সালমানের সিংহাসনে আরোহণের বিরোধী ছিলেন। আর এ কারণেই এ প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে যে, যুবরাজ কি তাদের প্রভাববলয়কে নিজের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পথে প্রতিবন্ধক মনে করছেন? সে কারণেই বাধা সরিয়ে দিতে উদ্যোগী হয়েছেন তিনি?

সমালোচকদের মতে, মোহাম্মদ বিন সালমান চরমভাবে একজন ক্ষমতালিপ্সু যুবরাজ। দুই বছর আগেও সিংহাসনের দৌড়ে তার অবস্থান ছিল তিন নম্বরে। কিন্তু রাজা বয়োবৃদ্ধ বাবার প্রশাসনে তিনিই হয়ে উঠেছেন এককভাবে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। সিংহাসনের দৌড়েও তার অবস্থান এখন এক নম্বরে। অর্থাৎ, বর্তমান রাজার মৃত্যু হলেই তার স্থলাভিষিক্ত হবেন মোহাম্মদ বিন সালমান।

সৌদি আরবের রক্ষণশীল ভাবমূর্তি থেকেও বেরিয়ে আসতে চাইছেন মোহাম্মদ বিন সালমান। তার ভাষায়, ‘অতীতে আমরা এই রকম রক্ষণশীল ছিলাম না। আমরা যেখানে ছিলাম ফের সেখানেই ফিরতে চাই— উদার ইসলামে ফিরতে চাই।’

দ্য গার্ডিয়ান’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পর সৌদি আরবেও কট্টরপন্থী ইসলামের শেকড় বিস্তৃত হয়। পুরো আমরা জানতাম না, কিভাবে এটা মোকাবিলা করতে হতো। সমস্যা হচ্ছে এটা পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। এখন সময় এ থেকে মুক্তি পাওয়ার।

লোহিত সাগরের সৈকতে বিচ রিসোর্টের পরিকল্পনার কথাও ঘোষণা করেছেন যুবরাজ। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, সেখানে নারীদের বিকিনি পরার সুযোগ দিতে বিশেষ আইন প্রণয়ন করা হবে। আগামী বছর থেকে গাড়ি চালানো এবং স্পোর্টস স্টেডিয়ামে গিয়ে কনসার্ট উপভোগের সুযোগ পাবেন নারীরা। সৌদি যুবরাজ গত সেপ্টেম্বরে ইসরায়েল সফর করেছেন বলেও খবর বেরিয়েছে। তবে ইসরায়েলি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত ওই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

সৌদি আরবের এক সময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ধর্মীয় পুলিশের ক্ষমতাও লক্ষ্যণীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। তাদের হাতে আর লোকজনকে গ্রেফতারের ক্ষমতা নেই; সেটা মানুষ ন্যায় করুক আর অন্যায়ই করুক। তবে শুধু ধর্মীয় পুলিশ নয়; সৌদি প্রশাসনের নানা স্তরে এভাবে ঝাঁকুনি দিয়েছেন মোহাম্মদ বিন সালমান। তার সবচেয়ে সাহসী এবং একইসঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপটি ছিল শনিবার একসঙ্গে রাজপরিবারের ডজনখানেক সদস্যকে আটক করার সিদ্ধান্ত। তবে এ যাত্রায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পাশে পেয়েছেন যুবরাজ। ট্রাম্প বলেছেন, ‘বাদশাহ সালমান ও যুবরাজের প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তারা যা করছেন, বুঝেশুনেই করছেন। আটককৃতদের অনেকেই তাদের নিজে দেশের সঙ্গে বিরুপ আচরণ করছেন।’

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান বলছে, রাজপরিবারের সদস্যদের এভাবে আটকের বিষয়টিকে এখনও একটি বড় ধাক্কা হিসেবেই দেখছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। দেশটির একজন কর্মকর্তার ভাষায়, আমরা মুক্ত বাণিজ্যের কথা বলছি। কিন্তু এখানে ভালো ব্যবসা করার ব্যাপারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনও একটি বড় বিষয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সৌদি আরবের একজন সিনিয়র মন্ত্রী দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, সৌদি আরব আর আগের জায়গায় নেই। এটি একটি বিপ্লব। কিন্তু সবকিছুই সংবেদনশীল। সবকিছু একটা পর্যায়ে না আসা পর্যন্ত আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে।

দ্য আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র নন রেসিডেন্ট ফেলো ড. এইচএ হেলিয়ার। তার মতে, যেসব পরিবর্তন ঘটছে তার অর্থ এটা নয় যে, সৌদি নেতৃত্ব এখন ওয়াহাবি মতবাদকে অস্বীকার করছে। দর্শনগত জায়গা থেকে একটা পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু সৌদি ধর্মীয় নেতৃত্ব কি এখন ওয়াহাবি মতবাদকে ধারণ করে না? এটা হবে একটা বড় ধরনের রূপান্তর। যুবরাজ এ ব্যাপারে আগ্রহী হবেন বলে আমি নিশ্চিত নই। আমরা যদি দেশটিতে একটি অ-রক্ষণশীল ব্যবস্থা প্রত্যাশা করি, তবে আমার মতে সেটা হবে দিবাস্বপ্ন। প্রশ্ন হচ্ছে, স্বল্প সময়ে এই সমাজ আদর্শিক ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আদতে কতটুকু প্রত্যাবর্তন করতে পারবে?

যুবরাজের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা দ্য গার্ডিয়ানকে জানিয়েছেন, মোহাম্মদ বিন সালমান নিজেকে মুসলিম (সুন্নি) বিশ্বের নেতা হিসেবে দেখতে চান। এজন্য তাকে প্রকাশ্যে ও জোরালোভাবে এটা প্রমাণ করতে হবে যে, আমরা ইসলামের মূল জায়গা থেকে সরে গিয়েছি।

আরেক ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ইতোপূর্বে যারা সৌদি আরবের রাজা হয়েছেন সিংহাসনে আরোহণের সময় তাদের প্রত্যেকেরই বয়স ছিল ৭০ বা ৮০-এর ঘরে। ফলে এই বয়সে তাদের পক্ষে এ ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব ছিল না।

তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ! আপনি বলতে পারেন লোকজন কথা বলতে খুব ভয় পাচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে, ক্ষমতা এখন কেন্দ্রীভূত। কিন্তু তার যা করার তিনি তাই করে যাচ্ছেন। তিনি নিজের ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করতে চাইছেন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে যে কেউই এটা চাইবে। আর সেক্ষেত্রে সবসময় হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটবে।’

প্রিন্সদের আটকের বিষয়টি এক বছরের বেশি সময় ধরে পরিকল্পনা করা হচ্ছিলো বলে দাবি করেছে ওয়াশিংটন পোস্ট। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ব্রুস রিডেল বলেন, সৌদি রাজনীতির অভ্যন্তরীণ গবেষক ও পর্যবেক্ষরা বর্তমান পরিস্থিতিকে রাজপরিবারের কোন্দল বলে মনে করছেন। কারণ এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই যে, বাবার মৃত্যুর পর মোহাম্মদ বিন সালমান খুব সহজেই সিংহাসনে বসতে পারবেন।